সুন্দরবন দিবস, ভালবাসা দিবসে ভালবাসুন সুন্দরবনকে।


সাগর দানবের ভ্রুকুটিল চোখ নেমে যায় সুন্দরী পাহারাদারের সামনে। কোমর ঝুঁকিয়ে নজরানা দিতে হয় বনবিবির বাহন বড় মিঞাকে। ততক্ষণে সুন্দরীর মায়াজালের নাগপাশে আটকে পড়েছে ঘূর্নি দানব। এই দানব সিডর,আয়লা,আমফান, কতরকম নামে রূপে
এসেছে, ভবিষ্যতে আরও আসবে-কিন্তু কুহকিনী পাহারাদার থেকে নিষ্কৃতি নেই। ১৪ ফেব্রুয়ারি, লাল গোলাপ কিনুন এই সুন্দরীর জন্য- আজ ‘সুন্দরবন দিবস’ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অক্সিজেন ভাণ্ডার। বিরাট বনাঞ্চলের টাটকা হাওয়ার প্রথম অংশীদার লক্ষ লক্ষ বাঙালি,যাদের কথ্যভাষায় ‘সুন্দরবন’ বিশ্বের চমক। ডোরাকাটা বাঘ, ময়াল, হরিণ, মাছ, মধু, বনজ সম্পদের বিরাট এই ভাণ্ডারের পাহারাদার ‘বড় মিঞা’ বা ‘দক্ষিণ রায়’ আর বিশ্বের কাছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

কুড়ি বছর আগের কথা। ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনের বৃহত্তম অংশীদার বাংলাদেশ থেকে উঠে এসেছিল এমন আওয়াজ-"রক্ষা করো এই আদিম প্রহরী কে"। বহু গবেষক বারবার যে দাবি করেছেন, সেটাই আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশ-এর উদ্যোগে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলন থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয়।
#একনজরে_সুন্দরবন: সুন্দরবন, প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে-পুরোটাই পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশে সুন্দরবন দিবস পালন হলেও ১৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দিকে দিনটি প্রায় অনালোচিত থাকে। তবে সুন্দরবনকে ভালোবাসো, যত্ন করো, রক্ষা করো এই দাবি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চ ২০০৩ সাল থেকে ২১ আগস্ট সুন্দরবন দিবস হিসাবে পালন করে আসছে।
এই বনভূমি না থাকলে যে কোনও একটা ছোটখাটো সামুদ্রিক ঘূর্ণির ছেঁয়ায় পশ্চিমবঙ্গের তিনটি জেলা উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা আর বাংলাদেশের তিনটি জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটে মৃত্যুর মিছিল নিশ্চিত। সীমান্তের এপার বা ওপার লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্ষাকারী সুন্দরবন। ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে এই বনাঞ্চল।
আজ সুন্দরবন দিবস, ভালবাসা দিবসে ভালবাসুন সুন্দরবনকে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সুন্দরবন দিবস পালিত হয়ে আসছে।
২০০১ সালের সে হিসেবে এবার পালিত হচ্ছে ২১ তম সুন্দরবন দিবস।
প্রতিনিয়ত বনখেকোদের আগ্রাসনের ফলে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ হুমকির মুখে। সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ গোটা দেশের পরিবেশ।
প্রসঙ্গত, সুন্দরবন রয়েছে ৫ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ রয়েছে।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় দিনটি। এরপরও সুন্দরবনের প্রতি ভালোবাসা আর মমতা সৃষ্টিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে পালিত হয় সুন্দরবন দিবস। প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর এই বনাঞ্চল লাখো মানুষের জীবিকার সংস্থান করে চলেছে। ঝড়-ঝঞ্ঝায় এখনও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বাঁচাতে সুন্দরবনের ভূমিকা যে অপরিসীম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, বনের প্রতি অতিনির্ভরতা এবং মানুষের নির্বিচার আচরণে দিন দিন বিপন্ন হচ্ছে এর পরিবেশ ও প্রতিবেশ।
বন বাঁচলে, বাঁচবে দেশ
মারুফ বিল্লাহ
জুনিয়র কনটেন্ট অফিসার
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা

Comments

Popular posts from this blog

Rethink these are the 7 Rs of Sustainability